অর্থনৈতিক দুরবস্থা, মুদ্রাস্ফীতির চাপ ও কর্মসংস্থান খাতে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের মে মাসে দেশটিতে বেকারত্বের হার বেড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা গত চার বছরে সর্বোচ্চ। টানা তৃতীয় মাসের মতো মজুরি বাড়ার হারও কমেছে। পাশাপাশি নিয়োগ কার্যক্রমও হ্রাস পাচ্ছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর ও সুদহার বৃদ্ধির চাপ একসঙ্গে পড়ছে শ্রমবাজারে। এতে ভোক্তারা খরচ কমাচ্ছেন। ব্যবসার খরচও বাড়ছে। তাছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতি ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে। তবে পরিস্থিতি খুব একটা ভয়াবহ নয় বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, মজুরি বাড়ার হার এখনো স্থিতিশীল রয়েছে এবং ছাঁটাইয়ের হার বাড়লেও তা অস্বাভাবিক নয়।
নিয়োগ সংস্থা ম্যানপাওয়ার গ্রুপ ইউকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল স্টুল বলেন, ‘চাপের মধ্যেও শ্রমবাজার স্থিতিশীল রয়েছে। সাম্প্রতিক নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির মধ্যেও নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছুটা আস্থা ফিরছে।’
কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর থেকে ব্যবসায়ীরা সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে লেবার সরকারের অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভসের বাজেটে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয় বীমা খাতে ২ হাজার ৫০০ কোটি পাউন্ড বাড়ানো ও ন্যূনতম জাতীয় মজুরি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এতে খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা কর্মী ছাঁটাই ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির হুমকি দিয়েছেন।
সে হুমকি যে বাস্তবতা হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ মিলেছে জুনের মূল্যস্ফীতির হারে। সরকারি তথ্য বলছে, রেস্তোরাঁ, হোটেল ও সুপারমার্কেটে পণ্যমূল্য বেড়েছে। এর পেছনে উচ্চ নিয়োগ ব্যয় অন্যতম কারণ।
জুনে যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলোর পে-রোলে থাকা কর্মীর সংখ্যা কমেছে ৪১ হাজার। নিয়োগ সবচেয়ে কমেছে আতিথেয়তা ও খুচরা খাতে। এসব খাতে খরচ বেড়ে যাওয়াই প্রধান কারণ। এছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। ফলে মানবকর্মী নিয়োগে আগ্রহ কমে গেছে।
তবে শ্রমবাজারের তথ্য বিশ্লেষণে কিছু বিভ্রান্তিকর দিকও রয়েছে। একই সঙ্গে বেকার ও কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, অনেক কর্মক্ষম ব্যক্তি অর্থনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা থেকে বের হয়ে কর্মসংস্থানে ফিরছেন। যদিও যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান অফিসের (ওএনএস) তথ্যসংগ্রহে স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সব মিলিয়ে যদিও শ্রমবাজারে শীতলতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তবে মজুরি বাড়ার হার এখনো শক্তিশালী। মে মাসে মোট মজুরি বার্ষিক হারে বেড়েছে ৫ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক মাসগুলোর তুলনায় কম হলেও ২০১০-এর দশকের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি হারে বেড়েছে মজুরি।
মজুরি প্রবৃদ্ধিই ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মজুরি বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ছে, যা সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমানে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত ২ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি।
আগামী ৭ আগস্ট ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের নীতিনির্ধারণী বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, নীরব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শ্রমবাজারে শ্লথতার কারণে ব্যাংক সুদহার এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে ৪ দশমিক ২৫ শতাংশে আনতে পারে। সরকারের জন্য এটি কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে, বিশেষ করে আসন্ন বাজেট ও কর বৃদ্ধির গুঞ্জনের আগে।